চাঁদ দেখা নিয়ে বিতর্ক
প্রায় ১ ব্ছরে ৫২টা শুক্রবার দেখ্লাম সৌদি আরবের সাথে মিলে গেল শুধু ঈদ মিলছে নাহ্
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ১৯৩টি দেশের মধ্য ১৭৩টি দেশ কাল বৃহস্পতিবার ঈদ পালন করবে ইনশাআল্লাহ
রেফারেন্স হিসেবে ভাল লেগেছে খালিদ সাইফুল্লাহ আর আসাদ হিমু ভাইয়ের লিখন
ঘড়ির সময় হিসেবে সৌদি আরব থেকে ৩ ঘন্টা এগিয়ে বাংলাদেশ। তাদের +৩ আর আমাদের +৬। এখন বোঝার জন্য আমার জানতে চাওয়া ঘড়ির সময় হিসেবে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত উভয়ই আমাদের আগে হওয়ার কথা। যদি তাইই হয় তাহলে চাঁদ ও আমরা আগে দেখতে পাওয়া কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা পরে দেখি। আমরা কি আসলে নতুন চাঁদই দেখি নাকি এই ৩ ঘন্টার ব্যবধানের কারণে একদিন পরে গিয়ে পুরান চাঁদ দেখি? বিষয়টা যদি কেউ একটু বুঝিয়ে দিতেন।
সবাই সব কিছু জানবে বা একভাবেই বুঝবে এমন কোন কথা নেই। বিষয়টা জানিনা/বুঝিনা তাই বুঝতে চাইছি।
সমস্যা হল, আমরা সৌর ও চন্দ্রের হিসেবকে মিলিয়ে ফেলি। সৌর হিসেবে সৌদি আরবের সাথে আমাদের পার্থক্য মাত্র ৩ ঘণ্টা হলেও চন্দ্রের হিসেবে সৌদি আরব ও আমাদের পার্থক্য ২১ ঘণ্টার!
পৃথিবীর গতির কথা তো জানিই। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারিদিকে পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরে চলেছে প্রতিনিয়ত। যার আহ্নিক গতি বলি। গতিটা সহজে বোঝা যাবে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক বা অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ (Anti Clockwise) বললে। চাঁদ তো ধীরে ধীরে আবর্তন করছে। ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন পশ্চিম দেশ সবার আগে চাঁদের উন্মোচন দেখতে পায়। আমরা তো জানিই, সূর্যোদয় হয় পূর্ব থেকে? তবে চাঁদের ক্ষেত্রে উল্টো। যদিও চাঁদ পূর্বে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়, তবুও পশ্চিমারা চাঁদের আলো সবার আগে পায়।
কেন এক দেশে চাঁদ দেখা গেলেও অন্য দেশে দেখা যেতে দেরি হতে পারে। কেননা খালি চোখে চাঁদকে দেখতে হলে চন্দ্র আর সূর্যের মাঝে ১০.৫ ডিগ্রি কোণ থাকতেই হবে। এবং যে পরিমাণ দূরত্ব অর্জন করলে এই কোণ তৈরি হবে, সে পরিমাণ যেতে যেতে চাঁদের ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। এ কারণেই আজ আমেরিকাতে চাঁদ দেখে গেলেই যে বাংলাদেশেও দেখা যাবে, সেটা ভুল ধারণা। যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই কোণ অর্থাৎ ১০.৫ ডিগ্রি অর্জন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাবে না। একই বিষয় সৌদি আরব ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। এই সংকট কোণকে ইলঙ্গেশন (Elongation) বলে। তাই চাঁদের বয়স কত সেটা আদৌ আসল কথা নয়, সেই কোণ হয়েছে কিনা সেটার উপর নির্ভর করে চাঁদ দেখা যাবে কিনা।
ফলে আমরা সৌদি আরব থেকে ৩ ঘণ্টা সূর্যের হিসেবে এগিয়ে থাকলেও, চাঁদের হিসেবে ২১ (২৪-৩=২১) ঘণ্টা পিছিয়ে আছি। ২১ ঘণ্টা প্রায় ১ দিন। অর্থাৎ আমরা প্রায় একদিন পিছিয়ে আছি। সেজন্যই সৌর বছরের হিসেবে একদিন পরে চাঁদ দেখি। তবে চন্দ্র বছরের কথা বললে আমরা সবাই একই দিনেই সব করি। তাই কারো এমনটা ভাবার কিছু নেই যে সবাই ভিন্ন দিনে রমজান বা ঈদ পালন করে। সবাই একই দিনেই পালন করে। কিন্তু সেটা যদি ইংরেজি বর্ষপঞ্জি দিয়ে যাচাই করেন, সেটা নিতান্তই বোকামি হবে। শেষ কথা হল, চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী পুরো পৃথিবীর সকলেই একই দিনে রমজান, ঈদ পালন করে। শুধু টাইমজোন (Timezone) আলাদা বলে এমনটা মনে হয়।
‘বঙ্গদেশের পূর্ব দিকে চায়না ও পশ্চিমে পাকিস্তান চাঁদ দেখে আগের দিন। আর বাংলাদেশ দেখে পরের দিন। ব্যাপারটা তাহলে কী হল? একটা উদাহরণ দিলে ক্লিয়ার হবে।
ধরি একটা সোনালি রঙের বাস ফার্মগেট থেকে রওনা করল গুলিস্তান যাবে। ফার্মগেটের লোকজন সোনালি রঙের বাসটিকে দেখল। কারওয়ানবাজারের লোকও দেখল। শাহবাগ এলাকার লোকেরাও দেখল। শুধু বাংলামোটর এলাকার লোক দেখতে পেল না। তার অর্থ কি এই যে বাসটি বাংলামোটর এলাকার ওপর দিয়েই যায়নি। বাসটি সোজা পথেই চলেছিল। দোষ কার বাসটির নাকি এলাকার লোকের? আমার জানামতে চাঁদ দেখা কমিটির বেশিরভাগ লোকই চশমা ছাড়া পেপার পড়তে পারেন না। তাদের সারা দেশের কমিটির অবস্থাও তাই।
আরে ভাই চাঁদ থাকে মেঘের আড়ালে। মেঘের ওপর উঠা কোনো কঠিন কাজ নয়। একটা হেলিকপ্টার নিলেই তো হয়। তা নেবে না কারণ নবীজির আমলে তো আবার হেলিকপ্টার ছিল না।
জ্বর হলে প্যারাসিটামল ঠিকই খায়। যদিও ওই আমলে প্যারাসিটামল ছিল না। আর সেগুলোর কিসের দরকার? পৃথিবীর কোন অঞ্চলের কোন জায়গায় চাঁদ ও সূর্য কতটা মিনিট কত সেকেন্ডে অবস্থান করে তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। অবাক হতে হয় যখন দেখি কিছু চোখওয়ালা মানুষ কিছু বিজ্ঞানবিমুখ মান্ধাতা আমলের সেকেলে চিন্তাধারার বনি আদমের অন্ধ অন্সুরণ করছে।
চাঁদ দেখা কমিটির লোকেরা আমলানির্ভর হয়ে থাকে। তাদের নিজস্ব কোনো সোর্স থাকে না। থানার দারোগা পুলিশের সোর্স আছে, তাদের বাজেট আছে কিন্তু চাঁদ দেখা কমিটির লোকেরা আসরের পর থেকে সভাকক্ষে হাজির হয়ে শীতল ঘরে বসে থাকেন। নিজেরা চাঁদ দেখতে চেষ্টা করেন না। এমনকি জনগণ মেসেজ পাঠালে বা ফোন দিলে সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তাদের উচিত নিজেদের বিশ্বস্ত সোর্স রাখা। জনগণ কেন গাঁটের পয়সা খরচ করে ফোন দিতে যাবে? ফোনগুলো কি টোল ফ্রি? বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের মোড়কে পণ্যের অভিযোগ মতামতের জন্য টোল ফ্রি নাম্বার দেয় আর আমাদের চাঁদ দেখা কমিটি তা দিতে পারে না।
বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য চাঁদ দেখার বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন চাঁদ দেখা এবং সে মোতাবেক হিজরি মাস গণনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ওপর দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। কমিটি প্রতি বছর রমজানের চাঁদ আরব বিশ্বসহ প্রায় সব দেশের এক দিন পরে দেখতে পায়। কিন্তু এবারে চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক শাবানের চাঁদ দেখা গেছে দুই দিন পর। সে হিসেবে বাংলাদেশের মুসলমানরা আরব বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের মুসলমানের চেয়ে দুই দিন পর শবেবরাত উদযাপন করেছে। শাবানের হিসাবে আরব বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের দুই দিন পর বাংলাদেশে রোজার মাস শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের এক দিন পর রমজানের চাঁদ দেখার ঘোষণা আসে। যা এই দেশের গতানুগতিক ঐতিহ্য বলে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন থাকে, আরব বিশ্বসহ প্রায় সব মুসলিম রাষ্ট্রে এক দিনে চাঁদ দেখলে বাংলাদেশ কেন পরদিন দেখবে? পৃথিবী একটি, চাঁদও একটি
Comments
Post a Comment